বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি বছর সংসদের প্রথম অধিবেশনে এবং সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার একটি সাংবিধানিক রীতি রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রপতি নিজের স্বাধীন মতামত অনুযায়ী সেই বক্তব্য দিতে পারেন না। সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের প্রস্তুত করা লিখিত ভাষণই তাঁকে পাঠ করতে হয়। বহু বছর ধরে এভাবেই এই প্রথা চলে আসছে, এবং এখন পর্যন্ত তা পরিবর্তনের কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগও দেখা যায়নি।
রাত ১টার মধ্যে তিন অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আশঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত
এই কারণে অতীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, বিএনপি সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির মুখে আওয়ামী লীগের সমালোচনা শোনা গেছে, আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম
সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে সাধারণত যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে কার্য উপদেষ্টা কমিটি, বিশেষ কমিটিসহ মোট সাতটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটিগুলো গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এসব কমিটিই সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি, জনসমাগম কম
প্রথা অনুযায়ী বিগত সংসদ এবং বর্তমান সংসদের মধ্যবর্তী সময়ে যেসব সাবেক জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এ তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজনের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বিষয়ে কোনো পক্ষ থেকেই আপত্তি তোলা হয়নি এবং স্পিকার সংক্ষিপ্তভাবে সব নাম অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানান।
বিরোধী দলের প্রতিবাদ
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনবে না এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের দাবি তুলবে। তবে সংসদে এ ধরনের প্রস্তাব পাস করতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন অপরিহার্য হওয়ায় তারা মূলত প্রতীকী প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়।
রাষ্ট্রপতি যখন ভাষণ শুরু করেন, তখন বিরোধী দলের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানান এবং পরে অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান।
জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক
সংসদের কার্যক্রম চলাকালে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় বিরোধী দলের কিছু সদস্য আসনে বসে থাকার ঘটনাও আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তাঁরা তখন সংগীত বাজানোর বিষয়টি শুনতে পাননি। পরবর্তীতে তাঁরা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছেন বলেও দাবি করা হয়।
রাষ্ট্রপতির পদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
রাষ্ট্রপতির পদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু সময় এই পদকে কার্যত ক্ষমতাসীন সরকারের নির্দেশ অনুসরণকারী হিসেবে দেখা গেছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক ভাষণও ছিল সরকারের অনুমোদিত বক্তব্য।
এই বক্তব্যে সরকারকে প্রশংসা করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেন। তবে অতীতের অন্যান্য সময়ের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তিনি উল্লেখ করেননি।
এছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সরাসরি বলা হয়নি। পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা “সকল নেতা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগের ও বর্তমান বক্তব্যের পার্থক্য
রাষ্ট্রপতির আগের একটি ভাষণের সঙ্গে সাম্প্রতিক বক্তব্যের তুলনা করলে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। পূর্ববর্তী ভাষণে তিনি একটি জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং বিরোধী পক্ষকে দেশবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে জনগণের ত্যাগের মাধ্যমে দেশ গণতন্ত্রের নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে।
এই দুটি বক্তব্যের পার্থক্য থেকেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ধরনের চিত্র ফুটে ওঠে।
রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা ও ইতিহাস
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদে বহু ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে খুব কম সংখ্যক রাষ্ট্রপতি নিজস্ব অবস্থান ও ব্যক্তিত্বের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে পেরেছেন। এর মধ্যে আবু সাঈদ চৌধুরী, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে কয়েক মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করতে হয়।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দুই দফায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে তাঁর বিদায়ও পুরোপুরি সম্মানজনক ছিল না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান ও বক্তব্যেরও পরিবর্তন ঘটে। রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক ভাষণ এবং পূর্ববর্তী বক্তব্যের পার্থক্য সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন।
অনেকের মতে, যদি সংসদকে সত্যিকার অর্থে সকলের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেবল সরকারের লিখিত বক্তব্য পাঠ করার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁকে নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি যেন রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীক না হয়ে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার প্রতিফলন হয়—এ প্রত্যাশাই এখন অনেকের।
[…] […]