চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিবারের পুরুষ সদস্য এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন। ফলে ঘরবাড়ির সামনে নারী ও শিশুদের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ছে। এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে দুটি অস্থায়ী তল্লাশি চৌকি স্থাপন করেছে পুলিশ, পাশাপাশি নিয়মিত টহলও চলছে।
সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে ২২ জনকে আটক করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরে পৌঁছাতে হলে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ–ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ব্যবহার করতে হয়। পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এই প্রবেশপথ। সড়ক দিয়ে কিছু দূর এগোলেই এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির আশপাশে একটি ছোট বাজার এবং কয়েকটি দ্বিতল মার্কেট থাকলেও বর্তমানে বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। সড়কের দুই পাশে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুলিশ একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করেছে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে বেঞ্চ ও টেবিলকে খাট হিসেবে ব্যবহার করে অবস্থান করছেন পুলিশ সদস্যরা। ক্যাম্পটির দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. নুরুল ইসলাম জানান, এখানে প্রায় ১৩০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন আছেন এবং এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের পর এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসীরা আর অবস্থান করছে না।
স্থানীয় বাজারের একজন বাসিন্দা মো. আনিস জানান, যৌথ অভিযানের পর থেকে বাজারে লোকসমাগম অনেক কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রায় স্থবির।
ছিন্নমূল এলাকায় কথা হয় মো. আলমগীর নামের এক বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি জানান, তার বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায়। প্রায় চার বছর আগে তিনি প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে এখানে একটি প্লট কিনে ঘর নির্মাণ করেছেন।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এই পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপকভাবে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। সড়কের আশপাশের বেশির ভাগ পাহাড় ইতোমধ্যে প্রায় উজাড় হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট পাহাড়গুলো ধাপে ধাপে কাটা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের সামনের একটি মোড় থেকে তিনটি রাস্তা বিভিন্ন দিকে গেছে, যার একটি আলীনগরের দিকে। এই পথে গেলে দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়া থেকে পাদদেশ পর্যন্ত অসংখ্য ঘরবাড়ি ও দালান নির্মিত হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগও রয়েছে অনেক জায়গায়।
আলীনগরের দিকে যাওয়ার পথে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড রয়েছে। অতীতে এখানে সশস্ত্র পাহারা দেখা গেলেও বর্তমানে সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশেও একটি বাজার ও কয়েকটি দ্বিতল মার্কেট রয়েছে, তবে দুটি ছাড়া প্রায় সব দোকান বন্ধ। এই বিদ্যালয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেকটি তল্লাশি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ২৩০ জন র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
এলাকার এক নারী বাসিন্দা আছিয়া বেগম জানান, গ্রেপ্তার আতঙ্কে তার স্বামী এবং দুই সন্তান বর্তমানে ঘরের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে বাড়িতে তিনি একাই আছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামে এক সন্ত্রাসী এই এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে তিনি একটি নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তোলেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সেখানে কম ছিল। এই সুযোগে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পাহাড়ি খাসজমি বিক্রি করা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্লট বিক্রির অর্থ ও জমির দখল নিয়ে ওই বাহিনীর ভেতর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হন।
এরপর তার সহযোগীদের মধ্যে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল গঠন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব দলের মাধ্যমে এলাকায় প্লট বিক্রি ও দখল কার্যক্রম চালু থাকে।
পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়াসিন মিয়া স্থানীয় একটি সমিতির নেতৃত্বে আসেন। অন্যদিকে কাজী মশিউর ও গাজী সাদেকের নেতৃত্বে আরেকটি সংগঠন গড়ে ওঠে। যারা এখানে প্লট কিনেছেন, তারা সাধারণত এসব সমিতির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। বর্তমানে এই দুই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক অভিযানের পর এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।