বিশ্ববাজারে আবারও তেলের দামে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে, যা ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১১৬ ডলার ১০ সেন্ট, যা দিনের মধ্যে প্রায় ৩.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও বেড়ে ১০২ ডলার ৩০ সেন্টে পৌঁছায়, যা ২.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে, এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে চলমান সংঘাতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তারা ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানোর ফলে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের সংযোগপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই রুটগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়; গ্যাসের দামও বেড়ে গেছে, যা সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় মূল্য প্রায় ৩.৯৮ ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার ছোট ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে, কারণ এই অঞ্চলে তেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে তেলের চাহিদা কমতে পারে, যা দাম কমানোর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হলেও দ্রুত তেলের দাম কমার সম্ভাবনা কম। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। উদাহরণস্বরূপ, কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রে হামলার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা বৈশ্বিক গ্যাসবাজারেও প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, এই অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারেও পড়েছে। এশিয়ার প্রধান সূচকগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক প্রায় ৪.৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেলের দাম যেখানে প্রায় ৭২ ডলার ছিল, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে তেলের দাম প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যতদিন অব্যাহত থাকবে, ততদিন জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের প্রবণতা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।